Sat. Dec 5th, 2020

প্রকৃতির পালাবদলে শীতকাল ঋতুটি নানা বৈচিত্রের সম্ভার হলেও সাথে নিয়ে আসে তার হিমশীতল পরশ ও নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ.তাই এই শীতে শরীর,মন,ত্বক ,চুলের পাশাপাশি বিশেষ যত্ন দরকার আপনার বহুমূল্য দাঁতগুলোরও. ইতিমধ্যেই অনেকে নিশ্চই আশ্চর্যান্বিত হয়েছেন শিরোনামটি পরে, কিন্তু  আসলেই আপনার দাঁত ও মাড়ি কে শীতকালে ‘উইন্টার ব্লুজ’ বা  ‘সিজনাল এফেক্টিভ ডিসর্ডার’ এর গুলোর মতো অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় এবং অগণিত সংখ্যক মানুষ এই  ঠান্ডা ঋতুতে আকস্মিক দাঁত ব্যাথা ও সংবেদনশীলতা অনুভব করে থাকেন।এই কারণে, ঠান্ডা আবহাওয়া সম্পর্কিত দাঁতের ব্যথা ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে জানা আবশ্যক। যুক্তরাষ্ট্রে  করা একটি গবেষণা অনুসারে প্রায় 40 মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে প্রতি আট জন মানুষ শীতকালে  সংবেদনশীল দাঁত সাথে  বর্ধিত ব্যথা অনুভব করেন. একাডেমী অফ জেনারেল ডেন্টিস্ট্রি অনুযায়ী, আপনার দাঁতগুলি ইতিমধ্যেই আঘাত পেয়েছে, যখন শীতকালে শ্বাসতন্ত্র ও ফুসফুসের দ্বারা গৃহীত ঠান্ডা বাতাস সংবেদনশীল দাঁত ও মাড়িতে আকস্মিক  গরম ও ঠান্ডা খাবার এবং পানীয় খাওয়ার পরের  তীব্র বেদনাদায়ক শিরশির অনুভূতি তৈরী করে । আমাদের মুখের তাপমাত্রা সারা বিশ্বে অনেক পরিবর্তন অভিজ্ঞতা করে, বিশেষ করে আমাদের সামনে দাঁত যা  অনেক সময় দিনে তাপমাত্রার পার্থক্য হিসাবে 120 ডিগ্রি পর্যন্ত সহ্য করার ক্ষমতা রাখে তবুও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়. 

কেন  দাঁতে এই ঠান্ডা আঘাত?শরীরের অন্যান্য অংশের  মত আমাদের দাঁতও নার্ভ  দ্বারা পূর্ণ এবং ঝাঁঝর সদৃশ,সেই সাথে সংবেদনশীল হয়। আমাদের মুখের মাধ্যমে ঠাণ্ডা বাতাসে আমরা শ্বাস ফেলি, আবার গ্রহণ করি এবং ঠান্ডার সংস্পর্শে দাঁত ও মাড়ির উপাদানগুলো সংকুচিত হয়ে যায় ও তাদের এই জমাট বাঁধা উপাদানগুলিই  সংবেদনশীল টিস্যু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেই অবস্থায় আপনি একবার আপনার মুখ বন্ধ করুন, দেখবেন আপনার  দাঁত এই ব্যাক আপ গরম তার টিস্যুগুলোর উপর প্রসারিত করবে ।এর মাধ্যমে বোঝা যে গ্রীষ্ম ঋতু তে ডট্ ও মাড়ি তাদের সহায়ক তাপমাত্রা পাওয়ার দরুন প্রসারিত অবস্থায় থাকে অর্থাৎ টোনড থাকে.কিন্তু শীতকালে তাপমাত্রা কম থাকার দরুন দাঁত ও মাড়ির এই সহনশীলতা বা ইলাস্টিসিটিও কমে. যার দরুন সময়ের সাথে সাথে আপনার দাঁতগুলি দীর্ঘমেয়াদি বড় সমস্যা প্রকাশ করতে পারে চুলের ফাটলের মতো সূক্ষ পরিবর্তনেও. স্বল্পমেয়াদি ক্ষেত্রে, এটি বাইরে থেকে আপনার দাঁত ব্যথার দিকে নিয়ে যায় এবং সারা মৌসুমে সংবেদনশীলতা বাড়ায়।  এই অবস্থায় দাঁতের ডেন্টিন এ {(টিস্যু যা কাস্ট করা হয় এবং দাঁতের এনামেল এর আরো গভীরে ক্ষুদ্র টিউবগুলির মধ্যে থাকে )যা দাঁত এর দ্বিতীয় স্তর,যা  প্রসারিত হয়.ও চাপ সৃষ্টি হলে  ফাটল গঠন করে }এই ফাটল  দৃশ্যমান নাও হতে পারে প্রাথমিকভাবে .তবে, এই অস্বস্তিকর সংবেদনশীলতা পরবর্তীতে স্নায়ু জ্বালা সৃষ্টি করে।

দাঁত ও মাড়ির সংবেদনশীলতার নেপথ্যে কে ? দাঁত ও মাড়ির সংবেদনশীলতার কারণগুলি নিম্নরূপ :1. ফাঁকা ফাঁকা দাঁত যেখানে ত্রুটিগুলি খোলা আছে2. খাদ্য এবং মুখ অ্যাসিড থেকে ক্ষতির সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ মুকুট বা সেতু মার্জিন।3. ফাটল দাঁত4. প্রান্তিক রোগ থেকে Recessed রুট5. ডুবো সমস্যা6. দাঁত নাকাল বা clenching7. সংক্রামিত দাঁত8. দাঁত যা ঝুলন্ত এবং সংবেদনশীল9. ক্যাভিটিজ বা দাঁতের ক্ষয় রোগ10. পেরিওডোনেটাল রোগ11. বড় ধাতু fillings 

দাঁত সংবেদনশীলতার  অতিরিক্ত কারণ:দাঁত সংবেদনশীলতা তখন বিশেষভাবে ঘটে যখন আমাদের দাঁতের শিকড় সঙ্কুচিত হয় কারণ  শিকড় আবরণ এক্সপোজড হয়ে যায় । এই অস্বস্তি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় না এবং সাধারণত কেবল স্নায়ুকে প্রভাবিত করে কারণ শিকড়ের সুষম স্নায়বিক চক্রগুলি খুব শক্তভাবে সম্মিলিত অবস্থায় থাকে যার শেষ প্রান্তে পৌঁছতে অনেকটা শক্ত কোনোকিছুর চাপ দরকার পরে. কিন্তু যদি কোনো কারণে  এই স্নায়ুশেষ পর্যন্ত স্পর্শ হয়ে যায় পরে এটি বেশ বেদনাদায়ক হতে পারে যার চিকিৎসা একমাত্র সম্ভব একটি নরম দাঁত ব্রাশ এবং একটি ফ্লোরাইড লেপ ব্যবহার. টুথ পেস্ট desensitizing হিসাবে সহজ হতে পারে যা  স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী ব্যথা ব্লক করতে দাঁত ও মাড়ির উন্মুক্ত সংবেদনশীল এলাকায় প্রযোজ্য. এলার্জি এবং সাইনাসের সমস্যাও অপরাধী হতে পারে বছর জুড়ে, সেইসাথে বছরের এই সময়টায় রোগীদের শ্বাস চাপ এবং সংক্রমণ অভিজ্ঞতা খুবই  সাধারণ। আপনার sinuses এর অবস্থান কারণে, এই ব্যথা এবং চাপ প্রায়ই দাঁত ব্যথা হিসাবে ভুল হয়। 

কি হতে পারে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ? আপনার দাঁতকে শক্তিশালী করার উপায়গুলির জন্য কিছু পরামর্শ এখানে রয়েছে যাতে আপনি শীত ও গন্ধহীন দাঁত, মাড়ি ও সামগ্রিক সুস্থ মুখ পেতে পারেন:1) আপনার নাকের মাধ্যমে শ্বাস ফেলা:সংবেদনশীল দাঁতের শত্রূ ঠান্ডা বাতাস। অতএব, শীতকালে যখন আপনি বাইরে থাকেন, তখন আপনার নাকের মধ্য দিয়ে শ্বাস নেওয়া ও ত্যাগ করার প্রবণতা গড়ে তোলা উচিত মুখ ব্যবহার করার পরিবর্তে । 2) গরম উষ্ণ পানীয় পান ও সাথে স্ট্র ব্যবহার:যখন আপনি কিছু গরম পান করবেন বা খাবেন , আপনার দাঁতের সাথে যতটা সম্ভব গরম পানীয় এর কম সাক্ষাৎ যেন ঘটে সে বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। সেক্ষেত্রে স্ট্র ব্যবহার উত্তম. 3) প্রয়োজনীয় DAILY DOSE এ ভিটামিন ডি গ্রহণ নিশ্চিত করুন:শীতকালীন সময়ের মধ্যে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এমন একটি শর্ত হল ভিটামিন ডি এর দৈনিক ডোজ গ্রহণ নিশ্চিত করা। কারণ আপনি নিশ্চয়ই  জানেন যে ভিটামিন ডি নিয়মিতভাবে আমাদের দাঁত এবং হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সূর্যালোক আমাদের শরীরকে ভিটামিন ডি তৈরি করতে সাহায্য করে। অতএব,  শীতকালে যখন আপনি সূর্যালোকের এক্সপোজার না পান তখন আপনার খাদ্য ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ হতে হবে.খাবার তালিকায়  যোগ করুন যেমন ফোর্টিফাইড সিরিয়াল , ডিম্ ,দুধ এবং ফ্যাটি মাছ। 4) মুখ সবসময় আর্দ্র রাখুন ও ড্রাই মাউথ সিনড্রোম প্রতিরোধ করুন :যখন আপনি ঠান্ডা কিছু পান করেন এবং আপনার নাক বন্ধ থাকার দরুন মুখের মাধ্যমে শ্বাস নিতে হয়, এই অত্যধিক মুখের শ্বাস শুষ্ক মুখ প্রবণতা বা ড্রাই মাউথ সিনড্রোম এর প্রধান কারণ যা ডেন্টাল decays , জিঞ্জিভিটিস (gingivitis /মুখের সংক্রমণ )ঝুঁকি বাড়ায় ফলাফল হিসেবে।এই সমস্যাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য আপনাকে নিয়মিত প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে এবং চিনিমুক্ত গামের পরামর্শ দিই যাতে আপনার মুখ আর্দ্র থাকতে পারে। চিনিযুক্ত পানীয় তে থাকা ক্যাফিন একটি ডাইইউরেটিক(মূত্রবর্ধক, কোষে পানি জমা করে রাখে এমন ) হিসাবে কাজ করে ফলে  আপনার শরীরকে ক্যাফিন খাওয়া সীমিত করানোর মাধ্যমে আপনার শুষ্ক মুখ সমস্যা বহুলাংশে কমে যাবে. 5) আপনার ডেন্টিস্ট এর কাছে নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ করা:এই সুপারিশ বাস্তবায়ন যদি সহজ করতে পারেন , তবে আপনার সংবেদনশীল দাঁত ও মাড়ির সমস্যা নিয়ে আর কোনো চিন্তা থাকবে না। ডেন্টিস্ট আপনাকে দাঁত ,মাড়ি ও মুখগহ্বর পরিষ্কার রাখার উপায় ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সার্বিক সহযোগিতা করতে অভিজ্ঞ. দাঁত ব্রাশ করা ও ডেন্টাল ফ্লসিং ব্যবহার করা আপনি তার মাধ্যমে জেনে নিয়ে সঠিক উপায়ে প্রয়োগ করলে দাঁত ও মাড়ি খাদ্যকণা,প্লাক,টার্টার,ক্যাভিটি এর মতো সমস্যা মুক্ত থাকবে, আপনার দাঁতগুলির  প্রাকৃতিক গঠনপৃষ্ঠ রক্ষা পাবে ।

6) একটি ভিন্ন টুথপেষ্ট ব্যবহার করে দেখুন:আপনি দাঁত ও মাড়ির সংবেদনশীলতা কমাতে ডেন্টিস্ট এর পরামর্শ অনুযায়ী নরম ব্রিসলের ব্রাশ ও ফ্লোরাইড টুথপেষ্ট ব্যবহার করুন,তিন মাস অন্তর ব্রাশ বদলান,মাড়ি ম্যাসেজ করার অভ্যাস  ও জিহবা পরিষ্কার রাখা শিখুন.  7) একটি ফ্লোরাইড ট্রিটমেন্ট ব্যবহার করুন:গ্লাস এবং rinses মত ফ্লোরাইড চিকিৎসা  সুবিধা গ্রহণ করুন। এই চিকিত্সাগুলি আপনার দাঁত ও মাড়ি  শক্তিশালী করবে এবং সম্ভাব্য সকল সমস্যা থেকে আপনার দাঁত রক্ষা করবে কারণ যখন আপনার দাঁত ফ্লোরাইড জেল দিয়ে আবৃত হয়, আপনার দাঁতের ভিতরের  স্নায়ু সুরক্ষিত থাকে । 8) শর্করা হ্রাস এবং এসিডিক খাবার গ্রহণ বর্জন করুন:অনেক মানুষ অম্লিক, মিষ্টি খাবার এবং পানীয় পছন্দ করে। তবে, অ্যাসিড এবং চিনির অত্যধিক পরিমাণে সেবন দাঁতের ব্যথা এবং দাঁত ক্ষয় রোগ এর কারণ. অতএব, আপনার স্বাস্থ্য ও দাঁত ভালো রাখার জন্য সোডা, ওয়াইন, ক্যান্ডি  এবং অনুরূপ খাবার এবং পানীয় খরচ কমাতে সুপারিশ করা হচ্ছে। এছাড়াও মনে রাখবেন যে তাত্ক্ষণিকভাবে আপনার দাঁত ব্রাশ করা উচিত নয় অম্লিক খাদ্য গ্রহণের পর কারণ তাতে দাঁতের এনামেল লেয়ার ক্ষতিগ্রস্থ হয় ও শির শির অনুভূতি তৈরী করে.

আরোকিছু :আপনার ডেন্টিস্টের সাথে পরামর্শ করে  ঠান্ডা শীতের মাসগুলিতে স্বাস্থ্যসহায়ক অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে. পরিহার করুন শক্ত ব্রাশ ও সজোরে ব্রাশ করে দাঁতের ক্ষতিসাধন .ব্যবহার করতে পারেন মাউথ ওয়াশ বা মাউথ রিন্স যা মুখ পরিষ্কার ও দুর্গন্ধমুক্ত রাখতে সাহায্য করবে.অবশই সঠিকভাবে ও ডেন্টিস্ট এর পরামর্শে. শিখে রাখতে পারেন মাউথ গার্ড ব্যবহার . বিশেষত যাদের রাতের বেলা দাঁতে দাঁত ঘষার (গ্রিন্ডিং) প্রবণতা আছে কোনো কারণে উত্তেজিত বা ভীত হলে.সেই সাথে দাঁত অতিরিক্ত সাদা বা চকচকে করে তোলার প্রবনতা পরিহার করুন.আদতে এর মাধ্যমে আপনি নিজের অজান্তেই বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে নিজ দাঁত ও মাড়ির ক্ষতি সাধন করছেন, কারণ প্রাকৃতিকভাবেই আমাদের দাঁত হালকা হলুদাভ.নিয়মিত পরিষ্কার রাখলে এমনিই ভালো থাকে.কিন্তু চকচকে বা সাদা বানানো মানে এনামেল লেয়ার এর ক্ষতি সাধন করে দাঁত সংবেদনশীল করে তোলা.যদি নিতান্তই করতেই হয় তবে বিশেষজ্ঞ ডেন্টিস্ট এর অধীনে চিকিৎসা নিন. দাঁতের ও মাড়ির যত্ন বিষয়ে সচেতন হওয়ার মাধ্যমে  নিজেদের এবং আপনাদের পরিবারকে  শীতকালে  নিরাপদে রাখুন।                               ‘ আর নয় শীতে ভয়,সচেতনতাই সঠিক উপায়.’

লেখক : রীপা চক্রবর্তীবি।ডি। এস,(ডিইউ)মাস্টার্স অন কোর্স(ইউনিভার্সিটি অফ হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন,লন্ডন)
সূত্রঃ উইকিপেডিয়া,ব্রিটিশ ডেন্টাল জার্নাল । 

By maitree

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *